কেন আমরা পিছিয়ে


কেন আমরা পিছিয়ে ? প্রশ্নটি এরকম । এ নিয়ে আজ কিছু কথা লিখতে চাই ।

অ্যামেরিকা, জাপান, রাশিয়া, চীন বানাতে পারেনা এবং কিছুর অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই বললেই চলে । তবে কেন তাদের নিজেদের পরিহিত পোশাক আমাদের মত থার্ড ওয়ার্ল্ড দেশগুলো থেকে বানাতে হয় ? এর পিছনে কারণ কি ? সহজ আবার কঠিন একটি প্রশ্ন । মাস কয়েক আগে ইরানের বিমান বাহিনীতে নতুন এক ধরণের ফাইটার জেড যুক্ত হতে না হতেই অ্যামেরিকা খোজ খবর নিতে শুরু করেছে, ইরান কিভাবে এই জিনিস বানালো ? ২০০০ সালে রাশিয়ান ক্রুডস সাবমেরিন আরটিক বিস্ফোরিত হয়েছিল । এই ঘটনায় প্রায় ১৮৩ জন রুশ নাবিক নিহত হন । আসল কাহিনী পড়ে জানা যায় । যেকোনো কারণে সাবমেরিনের ভিতরে থাকা এক্সপেরিমেন্টাল নিউক্লিয়ার টর্পেটরটি বিস্ফোরিত হয়ে পুরো সাবমেরিন ধ্বংস হয়ে যায় । এরপর থেকে রাশিয়া সিদ্ধান্ত নিল, তারা সাবমেরিন প্রযুক্তি আরও উন্নত করবে । এখন দুনিয়ার সেরা সাবমেরিন প্রযুক্তি রাশিয়ার যা অ্যামেরিকার কাছেও নেই ।
মূল প্রসঙ্গে আসি তবে একটু ভিন্নভাবে । একটা ব্যাপার একটু খেয়াল করে দেখবেন, থার্ড ওয়ার্ল্ড দেশগুলো কি কি ব্যাপার নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখায় আর উন্নত বিশ্ব সেটাকে কিভাবে ব্যবহার করে । আমাদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হল সেলাই মেশিন । তৈরি পোশাকে আমরা হলাম টপার । আর ওরা হল মিলিটারি টেকনলোজিতে টপার । শুধু তাই নয় । আমরা যে সময়গুলিতে তাদের জন্য ১০০ টাকার পোশাক বানিয়ে ১০ টাকা ওদের দেশ থেকে আমাদের দেশে নিয়ে আসছি, ঠিক সেই সময়টুকুতে ওরা নতুন কোন গাড়ি বানিয়ে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা । লোকসানটা যে আমাদেরই হল, ৬ মাসের উপার্জনে গাড়ি কেনা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিক তা কিন্তু চিন্তাও করেনা কখনও । আমরা স্বপ্ন দেখছি, ওদের থেকে কিংবা ওদের মত আমরাও উন্নত হব । কিন্তু যেখানে ইনপুটের থেকে আউটপুটই বেশি সেখানে উন্নত কি করে হাবো তা আমার মাথায় আসেনা ।
এখন বলবেন, মেধায় তো আমরা এতটা পিছিয়ে নেই । কোন একদিন তো আমরা বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারি । একটা বিষয় দেখেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ঢুকিয়ে দেয়া হল ছাত্ররাজনীতি এই রাজনীতিতে আমরাই সেরা । দেশের যেকোনো সমসাময়িক সমস্যা দেখা দিলেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রক্তে আগুন লেগে যায় । পড়ার টেবিল ছেড়ে রাস্তায় নেমে যায় আন্দোলন করতে । অপরদিকে ওদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো টপার হল মেধায় । আর সেজন্যে ওদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো প্রতি বছর টপ লিস্টে থাকে । আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বিখ্যাত হয় রাস্তায় আন্দোলন করে ।
এদিকে আবার ক্লাসে শিক্ষক কি পড়াচ্ছে ? আদৌ তিনি পড়াতে পারছেন কিনা । তার যোগ্যতার পুরস্কার কিংবা সমালোচনা কোনটাই নাই । যার দায়ভার ছাত্রকেই নিতে হবে । তাই হয়তো ক্লাস থেকে পালিয়ে যাওয়া ছেলেটাই সফল হয় ।
আন্দোলন তো সবসময় চলেনা । বাকিটা সময় তো পড়তে পারি । কিন্তু তার আর সুযোগ কোথায় । ওরা সেই রাস্তাটাও বন্ধ করে দিল । আমাদের হাতে ধরিয়ে দিল, আন্ড্রয়েড ফোন, ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি ইত্যাদি । পড়ার টেবিলে বসেও আমরা এগুলো নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম । আমাদের মাথায় ঢুকল, কিভাবে সবার মাঝে পরিচিত হওয়া যায় । এটাই এখন লক্ষ । কিভাবে মানুষকে অবাক করা যায় । শুরু হয়ে গেল ছবি তোলা আর ভিডিও করার প্রতিযোগিতা । শুধু পড়ার টেবিল নয়, স্কুল কলেজ ছেড়ে আমাদের ছেলেমেয়েরা হাতে কামেরা, আন্ড্রইড ফোন নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে । রাস্তা-ঘাট আর পার্কগুলোতে ।
এখানে আবার একটা নতুন পদ্ধতি চালু হয়েছে । ছেলেমেয়েরা মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিক পরিক্ষার আগেই অভিভাবকরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখে, পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করতে পারলে এমন একটা কামেরা আর আন্ড্রয়েড ফোন উপহার দেবে । এ যেন এমন, পরীক্ষায় ভাল করলে ছেলেমেয়েকে সাগরে ফেলে দিয়ে তাদের বলা হচ্ছে- এর পড়ের পরিক্ষার ফলাফল যেন আরও ভাল হয় ।
এবার আসি আমাদের সংস্কৃতির দিকে । আমাদের সংস্কৃতি রাতারাতি হয়ে গেল স্যাটেলাইট সংস্কৃতি । নিজেদের সংস্কৃতি বলতে কিছুই নেই । ভারত, চীন, অ্যামেরিকার কোন ছবিতে অভিনেতা-অভিনেত্রী কোন পোশাকে এসেছিল, কোন বাঁচন ভঙ্গিতে কথা বলেছে তা কপি করার প্রতিযোগিতায় আমরা আমাদের শেষ সংস্কৃতিটুকুও বিসর্জন দিয়ে দিয়েছি । আর উন্নত দেশগুলোর সংস্কৃতির দিকে আবারও লক্ষ করুন । তাদের সংস্কৃতি দেখায় জন্য বিশ্ব ব্যাপী চলে প্রতিযোগিতা যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে । সাকিব খান, আমিন খানের ছবি কিন্তু অ্যামেরিকায় চলেনা । অ্যামেরিকানরা সাকিব খান, আমিন খানের নামই জানেনা । অথচ অ্যাভেঞ্জারস দেখার জন্য আমরা হুমড়ি খেয়ে পরি । দোষটা সাকিব খান কিংবা, আমিন খানের নয় । দোষটা আমাদের সংস্কৃতি চর্চার । আমাদের মুভিগুলো যখন প্রেমালাপ, চুম্বন দৃশ্য আর সৌন্দর্য্য উপস্থাপনের দিকে এগিয়ে যায়, তখন অ্যামেরিকার মত দেশগুলো চিন্তা করে মহাকাশ তথা প্রযুক্তিতে আরও নতুন কি আবিষ্কার হয়েছে যা পরবর্তি মুভিতে যুক্ত করে একে তথ্য সমৃদ্ধ করা যায় । ব্ল্যাকহোলের দৃশ্য কিভাবে যুক্ত করলে তা বাস্তবের অধিক কাছাকাছি যেতে পারবে । আর তাই হয়তো ইন্টার্স্টেলার মুভিতে ব্যবহৃত ব্ল্যাকহোল বাস্তবের সাথে এতটা মিলে যায় ।
শত কোটি সাহায্যের নাম করে আমাদের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হল অপরিশোধ যোগ্য ঋণের বোঝা । আমাদের সৈনিকদের পাঠানো হয় শান্তি মিশনে । আর এতে আমরা সুনাম অর্জন করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করি । আর তাদের সৈনিকরা যায় দেশ দখল করতে । পার্থক্য বুঝতে পেরেছেন ?
আমাদের যখন আলোচনার বিষয়বস্তু, “জার্সির মধ্যে লাল রঙ নেই কেন ?” আর ওরা চিন্তা করে, কোন ধরণের প্রযুক্তি বানালে সেটা থার্ল্ড ওয়ার্ল্ড দেশগুলোতে বেশি দামে বিক্রি করে বেশি লাভ করা যাবে । আমাদের দেশে মানবিক বিভাগে পড়াশুনা করে কেউ কেউ হয়ে যায় বিজ্ঞান মনস্ক ।  তারা বিজ্ঞানের সবক দেয় । আবার কেউ কেউ আবার ইউটিউব দেখে দেখে হয়ে যায় ডাক্তার, কেউ কেউ রোবটও বানায় । অথচ ওদের দেশে আবিস্কারের উদ্ভাবন না থাকলে তাদেরকে বিজ্ঞান সেমিনারের টিকেটই দেয়া হয়না । আমাদের দেশে চেতনা চাপিয়ে দেয়া হয় । ওদের দেশে চেতনার ভুল ত্রুটি খোজা হয় । ওদের দেশে দেশের দুর্বল জায়গায় সারা বছর সৈন্য মোতায়েন করে রাখে । আর আমাদের দেশে পাহাড়ি এলাকায় সৈন্য কেন ? এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে আন্দোলন করা হয় । দেয়ালে পোস্টার লাগানো হয় । মিডিয়াতে হাসাহাসি আর কমেন্ট বক্সে আন্দোলনের ঝড় বয়ে যায় । ওদের সব চেয়ে বেশি খরচ হয় সামরিক খাতে । আর আমরা দুইটা ট্যাঙ্ক কিনলেই বিশ্ব ব্যাংক আই এম এফের চাপ শুরু হয়ে যায় । বিশেষ দূত আসে হুমকি দিতে । আমরা কেন সামরিক খাতে এত খরচ করি এর জবাব দিতে হয় । আসলে আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোয় গলদ । সমাজের বুদ্ধিজীবী অংশটার অনেকাংশেই মরে গেছে । এদের বেশিরভাগ সাধারণ মানুষকে বেঁচে খায় । তাই আমাদের এই দুর্দশা ।
তবে এ সব কিছুর মাঝেও আমরা সফলতা আনতে অপার চেষ্টা করি । যদিও জানি, সফলতা আমাদের থেকে অনেক দূরে ।
লিখছেন
জিওন আহমেদ
ইইই চুয়েট

Post a Comment

0 Comments