প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

আন্ডারগ্র্যাজুয়েটে ভর্তির মুহুর্ত পর্যন্ত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্র-ছাত্রীর স্বপ্ন থাকে, এখানে এসে তারা প্রযুক্তিতে নতুন কিছু আনবে । তাদের ইচ্ছা থাকে- নিজের ইচ্ছা, অভিজ্ঞতা এবং এই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তির নতুনত্বে নিজের অংশীদারিত্ব স্থাপন করবে । 

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হতে সার্টিফিকেট নিয়ে বের হয়ে যত দ্রুত সম্ভব চাকুরী করবে এমন স্বপ্ন দেখা ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব বেশি হবে বলে মনে হয়না । কিন্তু প্রথম বর্ষে ক্লাস শুরুর কিছুদিন পর থেকেই তার এই ইচ্ছা গুলো কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে । সে এসে দেখছে, যে প্লাটফর্মে এসে সে প্রযুক্তির জগতে নিজেকে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল সেটি তাকে যত দ্রুত সম্ভব সার্টিফিকেট দিয়ে বের করে দিয়ে সার্টিফিকেটধারী চাকুরীজীবী বানিয়ে দেয়ার চিন্তা করছে । স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এটা কিছুটা কার্যকরী হতে পারে । কিন্তু ছেলে বা মেয়েটি এবং তার পরিবারের ইচ্ছা কি এটা ছিল । একজন কৃষকও আশা রাখে, তার ছেলে কিংবা মেয়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে রোবট, গাড়ি, বাড়ি বানানো শিখবে । কিন্তু প্রকৌশলে এসে সে আবারও স্কুলের মত সারাদিন ক্লাস আর ল্যাবের পিছনে ছুটছে ।  অনেকে হয়তো বলবেন, হ্যাঁ, এই সময়ের তো সে ৫০% সময় তাত্ত্বিক এবং ৫০% সময়ে ল্যাব করার সুযোগ পাচ্ছে যার মাধ্যমে সে শিখতে পারে । কিন্তু ক্লাস আর ল্যাব থেকে তারা কতটা শিখতে পাড়ছে ? ক্লাসের কথা বাদই দিলাম । ল্যাব থেকে যতটা অর্জন প্রয়োজন আমার মনে হয় তার ২০% ও তারা পাচ্ছেনা এই ল্যাবগুলো থেকে । এখানে ল্যাব শেখানো হয় ল্যাব রিপোর্ট লেখার মাধ্যমে । আর ল্যাবে আপনাকে যে কম্পোনেন্টগুলো দেয়া হবে আপনি কেন আপনার শিক্ষকও জানেনা এটার আয়ু আছে নাকি নাই । তাই দিনশেষে আপনি আপনার সময়টা কোথায় কাটিয়েছেন তা আপনারও ধারণার বাইরে । এমনকি, ল্যাবের যে পারফর্মেন্স মার্কস সেইটাও পারফর্মেন্স দেখে হিসাব করা হয়না । আপনি ল্যাবে পুরোটা সময় খেঁটে ল্যাব মিলাবেন, অপরদিকে আপনার গ্রুপের অন্য এক বন্ধু ল্যাবে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার নিয়ে কাটিয়ে দিবে । হলে এসে আপনি যখন সেই ল্যাবের ক্যালকুলেশন নিয়ে বসে থাকবেন, সে তখন কারও কপি করে হলেও ল্যাব রিপোর্টটা লিখে ফেলবে, সেমিস্টার শেষে কুইজটার জন্য ল্যাব শিটগুলো মুখস্থ করে কুইজটা ভাল দেবে, দিন শেষে আপনি যখন B গ্রেড নিয়ে সেশনালে পাস করবেন, সে তখন A+ নিয়ে আপনাকে সমবেদনা জানাবে এগুলা দেখতে দেখতে আপনার হতাশা এক সময় চরম সীমায় উঠে যাবে আর এভাবে ১ বছর দেখতে দেখতে আপনিও তার গ্রুপে নাম লিখবেন একজন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মুখ্য চাহিদা থাকে, প্রকৌশল এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান চর্চার আপনি যদি এটাকে একটু লঘু করে দেখেন, তাহলে নরমাল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বিশেষত্ব হারিয়ে ফেলবেন
সমস্যা নিয়ে কিছু তো বললাম এবার সমাধানে আসি,
প্রথমত, নতুনত্বের চিন্তাগুলো যাতে শিক্ষার্থীরা লালন করতে পারে, তাদের ইচ্ছা গুলো যাতে মরে না যায় সেদিকে বেশি খেয়াল রাখা জরুরী বলে আমার মনে হয় । ল্যাবের ডিভাইস গুলো, এমনকি মিনি কম্পোনেন্টগুলো সংরক্ষণ এবং সরবরাহ আরও বাড়াতে হবে । থিওরি ভিত্তিক সেশনাল শেষে নতুন প্রজেক্ট আইডিয়া ক্ষেত্র বিশেষে বাড়ানো যেতে পারে । ল্যাবের কোন ডিভাইস নষ্ট হয়ে গেলে তা মেরামতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া প্রকৌশল বিদ্যাকে আরও সমৃদ্ধ করবে । সেক্ষেত্রে একটি রিসাইকেলিং ইউনিট থাকা অনেক বেশি কার্যকরী হবে । শিক্ষার্থীদের নিজেদের সৃজনশীলতাকে প্রয়োগ এবং বৃদ্ধির জন্য প্রতি সেমিস্টার শেষে একটি দীর্ঘ্য ছুটি অথবা সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো অথবা প্রতিদিনের একাডেমিক চাপ কমানো প্রয়োজন । সেক্ষেত্রে চার বছরের কোর্স পাঁচ বছরে শেষ করেও যদি একজন প্রকৃত ইঞ্জিনিয়ার বা গবেষক হয়ে বের হওয়া যায় তা আমাদের জন্য অনেক বেশি কার্যকরী হবে । তবে সময় এবং চাপ কমানোর জন্য সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়গুলো বাদ দেয়া কিংবা লঘু করা যেতে পারে । সময় ও মুক্তচিন্তার সুযোগ এবং উপস্থাপনের সুযোগ পেলে শিক্ষার্থীরা এগুলার শিক্ষা ক্যাম্পাস থেকেই অর্জন করতে পারবে । তবে এক্ষেত্রে যেকোন কোর্সেই কোর্স টিচার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ । একজন শিক্ষকের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হল, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারা । তার জানার পরিধির চেয়ে জানানোর পরিধি বেশি গুরুত্বপূর্ণ । আমার মনে হয়, বিনা বাধ্যবাধকতায় একজন শিক্ষকের, ক্লাসের ৭০ ভাগ শিক্ষার্থীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারা জরুরী । এতে ব্যার্থ হলে তিনি নিজের বুঝানোর পরিধি বাড়াতে পারেন । অন্যথায়, নির্দিধায় ধরে নেবেন তার জন্য হয়তো শিক্ষকতা ছাড়া অন্য কোন পেশা বেশি কার্যকরী । পাশাপাশি শিক্ষকতা পেশাকে একটি দেশের সর্বোচ্চ সম্মানের মানদন্ডে রাখা শিক্ষার্থীদের কাছে একজন শিক্ষককে অধিক সম্মানীয় করে তোলে । এছাড়া ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ, মুক্তচিন্তার সংগঠনগুলোর সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক যোগান আরও বাড়ানো জরুরী । আমার এই কথাগুলোর মধ্যে এমনও ইচ্ছা থাকতে পারে যা অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই । তবে সেক্ষেত্রে, পরীক্ষণীয়ভাবে চালানোই তো এক একটি গবেষণা । তাই অন্য কারও সাথে তুলনা করে নয়, বরং তাদের এবং নিজেদের ব্যার্থতা এবং সীমাবদ্ধতা থেকে আমরা শিক্ষা প্রহণ করব । সর্বোপরী, আমার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়টি হোক বাংলাদেশের প্রযুক্তির অগ্রগতির রোল মডেল ।

লেখকঃ
জিওন আহমেদ
ইইই চুয়েট

Post a Comment

0 Comments