পদার্থের বন্ধন

যেকোন পদার্থ আলোচনার সময় ওই পদার্থটি কোন কোন মৌলিক পদার্থ দিয়ে তৈরি সেটা জানা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় । পদার্থটির গঠনকারী মৌলিক পদার্থগুলোর আচরণ থেকে গঠিত পদার্থটির আচরণ সম্পর্কে ধারণা করা যায় । যদিও গঠনকারী মৌলিক পদার্থের সাথে গঠিত পদার্থের কোন মিল থাকেনা । তবে এক্ষেত্রে গঠিত পদার্থটিতে গঠনকারী মৌলিক পদার্থগুলো কোন ধরণের বন্ধনের মাধ্যমে আবদ্ধ আছে, সেটা জানা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় । সাধারণত পদার্থের এই বন্ধন কয়েক ধরণের হতে পারে । এগুলো নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক ।

পদার্থের বন্ধন

আমরা পদার্থের বিভিন্ন বন্ধন সম্পর্কেই জানি । যেমন-

  1. আয়নিক বন্ধন ।
  2. সমযোজী বন্ধন ।
  3. সন্নিবেশ বন্ধন ।
  4. ধাতব বন্ধন ।
  5. হাইড্রোজেন বন্ধন ।
  6. ভ্যান্ডারয়ালস বন্ধন ।

আয়নিক বন্ধন

ধাতব পরমাণু সমূহ, সর্বশেষ শক্তিস্তরে স্থায়ী ইলেকট্রন বিন্যাস লাভের জন্য ইলেকট্রন ত্যাগ করে ধনাত্মক আধান বিশিষ্ট পরমাণু বা ক্যাটায়ন উৎপন্ন করে । একই ভাবে, অধাতব পরমাণু সমূহ, সর্বশেষ শক্তিস্তরে স্থায়ী ইলেকট্রন বিন্যাস লাভের জন্য ইলেকট্রন গ্রহণ করে ঋণাত্মক আধান বিশিষ্ট পরমাণু বা অ্যানায়ন উৎপন্ন করে । বিপরীত আধান বিশিষ্ট হওয়ায় এরা একে অপরের উপর স্থির তড়িৎ আকর্ষণ বল বা কুলম্বিও আকর্ষণ বল প্রয়োগ করে । ফলে পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসে এবং বন্ধন গঠন করে । এ ধরণের বন্ধনকে বলা হয় রাসায়নিক বন্ধন । তাহলে, ক্যাটায়ন এবং অ্যানায়নের মধ্যে স্থির তড়িৎ আকর্ষণ বলের মাধ্যমে যে বন্ধন গঠিত হয় তাকে রাসায়নিক বন্ধন বলে ।

সমযোজী বন্ধন

সাধারণত অধাতব পরমাণু সমূহের সর্বশেষ শক্তিস্তরে অধিক সংখ্যক বা সমান সংখ্যক ইলেকট্রন থাকায় এরা ইলেকট্রন ত্যাগ এবং গ্রহণ করতে পারেনা । ফলে এরা ইলেকট্রন আদান প্রদান না করে সমান সংখ্যক ইলেকট্রন শেয়ারের মাধ্যমে বন্ধন গঠন করে । এ ধরণের বন্ধনকে বলা হয়, সমযোজী বন্ধন । তাহলে, অধাতব পরমাণু সমূহের সমান সংখ্যক ইলেকট্রন শেয়ারের মাধ্যমে যে বন্ধন গঠিত হয় তাকে সমযোজী বন্ধন বলে ।  

সন্নিবেশ বন্ধন

সমযোজী বন্ধনের ক্ষেত্রে বন্ধনে অংশগ্রহণকারী পরমাণুদ্বয় উভয়ই সমান সংখ্যক ইলেকট্রন শেয়ার করে থাকে এবং শেয়ারকৃত ইলেকট্রনের উপর উভয় পরমাণুর সমান আধিপত্য থাকে । সন্নিবেশ বন্ধনও এক প্রকার সমযোজী বন্ধন । এক্ষেত্রে শুধু শেয়ারকৃত ইলেকট্রনদ্বয় উভয় পরমাণু থেকে না এসে একটি পরমাণু বহন করে এবং একটি পরমাণু বহন করলেও উভয় পরমাণু তার উপর সমানভাবে আধিপত্য রাখে । অর্থাৎ, সমযোজী বন্ধনে শেয়ারকৃত ইলেকট্রন যুগল যদি উভয় পরমাণু থেকে না এসে একটি পরমাণু বহন করে তবে তাকে সন্নিবেশ বন্ধন বলে । এ বন্ধন বুঝানোর জন্য দাতা পরমাণু থেকে গ্রহীতা পরমানুর দিকে তীর চিহ্ন দেয়া হয় ।

ধাতব বন্ধন

ভৌত জগতের ধাতুর বন্ধনের মধ্যে বিশেষ ভিন্নতা দেখা যায় । সে জন্য ধাতব বন্ধনকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হয় । ধাতব পরমাণু থেকে ইলেকট্রন গুলো মুক্ত হয়ে উৎপন্ন আয়ন এবং মুক্ত ইলেকট্রনগুলো ধাতুর মধ্যে মুক্তভাবে অবস্থান করে । মুক্ত ইলেকট্রন থাকার ফলে ধাতু সহজেই তড়িৎ কিংবা তাপ পরিবহন করতে পারে । শুধু ধাতব বন্ধনে এমন বিশেষত্ব থাকার জন্য ধাতব বন্ধনের সংজ্ঞা দেয়া হয়, যে বন্ধনের মাধ্যমে ধাতু গঠিত হয় তাকে ধাতব বন্ধন বলা হয় ।

হাইড্রোজেন বন্ধন

হাইড্রোজেনের সাথে যখন উচ্চ তড়িৎ ঋণাত্মক মৌল (যে সব মৌল ইলেকট্রনকে বেশি আকর্ষণ করে) যুক্ত থাকে তখন সমযোজী বন্ধনে শেয়ারকৃত ইলেকট্রনকে উচ্চ তড়িৎ ঋণাত্মক মৌলটি হাইড্রোজেনের তুলনায় বেশি আকর্ষণ করে । ফলে বন্ধনে অংশগ্রহণকারী ইলেকট্রনগুলো উচ্চ তড়িৎ ঋণাত্মক মৌলের দিকে বেশি ঝুকে যায় । এতে করে হাইড্রোজেন পরমাণুটি থেকে ইলেকট্রন দূরে সরে যাওয়ায় এটি আংশিক ধনাত্মক এবং ইলেকট্রন ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ার ফলে উচ্চ তড়িৎ ঋণাত্মক মৌলটি আংশিক ঋণাত্মক আয়নে পরিণত হয় । এ রকম দুইটি অণু পাশাপাশি চলে আসলে একটি অণুর হাইড্রোজেন পরমাণু এবং অন্য অণুর উচ্চ তড়িৎ ঋণাত্মক পরমাণুর মধ্যে স্থির তড়িৎ আকর্ষণের ফলে একটি দুর্বল বন্ধন তৈরি হয় । এটিই হাইড্রোজেন বন্ধন । এ বন্ধন বুঝানোর জন্য ব্রেক লাইন (---) ব্যবহার করা হয় ।

ভ্যান্ডারওয়ালস বন্ধন

আমাদের মনে হতে পারে, ইলেকট্রনগুলো পরমাণুতে সুষমভাবে বিন্যস্ত থাকে । কিন্তু ইলেকট্রন যেহেতু গতিশীল তাই পরমাণুর সবটুকু অঞ্চল জুড়ে ইলেকট্রন সুষম ভাবে থাকা অসম্ভব । এমনটি হতেই পারে, গতিশীলতার কারণে পরমাণুর কোন এক পাশে ইলেকট্রনের ঘনত্ব কমে গেল এবং অপর পাশে বেড়ে গেল । তাহলে যা হবে, কম ঘনত্বের অঞ্চলে আংশিক ধনাত্মক এবং বেশি ঘনত্বের দিকে আংশিক ঋণাত্মক প্রান্ত তৈরি হবে । এর রকম দুইটি পরমাণু পাশাপাশি চলে আসলে আংশিক ধনাত্মক এবং আংশিক ঋণাত্মক প্রান্তের মধ্যে স্থির তড়িৎ আকর্ষণ বলের মাধ্যমে এক প্রকার দুর্বল বন্ধন তৈরি হবে । যাকে বলা হয়, ভ্যান্ডারয়ালস বন্ধন ।

বন্ধনের ধরন ভেদে পদার্থগুলোর কিছু আচরণ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে । এরুপ কিছু আচরনের মধ্যে রয়েছে-

  1. আন্তঃআনবিক বল ।
  2. স্থিতিস্থাপকতা । 

আন্তঃআণবিক বল

আমরা জানি, একই পদার্থের একটি অণু অপর একটি অণুকে আকর্ষণ করে যাকে আন্তঃআণবিক আকর্ষণ বলে । কিন্তু এটি শুধুমাত্র অণুগুলো একটি নিদিষ্ট দূরত্বে থাকলেই কাজ করে । এর চেয়ে বেশি কাছে চলে আসলে নিউক্লিয়াসের বিকর্ষণ বল কার্যকর হয় এবং অণুগুলো পরস্পরকে বিকর্ষণ করে । আবার দূরে সরে গেলে আকর্ষণ বল ধীরে ধীরে লোপ পায় ।

স্থিতিস্থাপকতা

জড়তা পড়তে গিয়ে আমরা পড়েছিলাম, ভৌত জগতের প্রত্যেকটি যেমন আছে তেমন থাকতে চায় । স্থিতিস্থাপকতা পদার্থের এমনই একটি ধর্ম । যেকোনো বস্তুকে স্বাভাবিক অবস্থা হতে অন্য অবস্থায় নিয়ে গেলে সেটি পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসার প্রবণতা দেখায় । বস্তুর এই ধর্মকেই স্থিতিস্থাপকতা বলে । যেমন একটি রাবারকে টেনে ছেড়ে দিলে এটি পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে আসে । এটি হয়, রাবারের স্থিতিস্থাপকতার কারণে । তবে এর একটি সীমা আছে । এর থেকে বেশি বল প্রয়োগ করলে এটি আর পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসেনা । একে স্থিতিস্থাপকতার সীমা বলা হয় । যেমন অধিক বলে বল প্রয়োগ করলে রাবার বা স্প্রিং আর পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসেনা ।


জিওন আহমেদ 

Post a Comment

0 Comments