চল তড়িতের এপিঠ ওপিঠ

জলন্ত চুল্লিতে কেরোসিন বা ডিজেল দিলে জ্বলতে থাকে কিন্তু সেখানে পানি দিলে কেন আগুন নিভে যায় ? বাসার আসবাব পত্র ভেঙ্গে গেলে তা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করে হলেও বাসার ইটের দেয়াল ভেঙ্গে গেলে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হয়না কেন ? এসব প্রশ্নে একটা সময় মেতে থাকতো ছোট রিফাত শাহরিয়ার । কিন্তু এখন ও কিছুতা বড় হয়েছে । আগুন জ্বলা না জ্বলা যে শুধুই কার্বনের উপস্থিতির এক পরিনাম, তা এখন ও ভালই বুঝতে পারে । এখন রিফাত আরও অনেক ক্রিয়েটিভ চিন্তা করতেও পারে । হাইড্রোজেন একটা দাহ্য পদার্থ তথা নিজে জ্বলে আর অক্সিজেন আগুন জ্বলতে সাহায্য করলেও এদের সমন্বয়ে গঠিত পানি কেন আগুন নেভাতে ব্যবহার করা হয় ? সেসব প্রশ্নের উত্তর ও জানে । কিন্তু ওর প্রশ্নের শেষ নেই । দিন যত যায়, প্রশ্নগুলো তত জটিল থেকে জটিলতর হয় । ওর চিন্তাগুলো শুনে মাঝে মধ্যে অনেক অবাক হলে বা হাসাহাসি করলেও তাতে ওর মাথা ব্যাথা নেই । মনের ভিতরের প্রশ্ন জাগলে তাকে তো ব্যাক্তি নিজেও দমাতে পারবেনা, এটাই স্বাভাবিক ।

বেশ কয়েকদিন হল, রিফাত চলতড়িৎ নিয়ে চিন্তায় মগ্ন । চিকন দুইটা তারের মধ্যে কি এমন রহস্য লুকিয়ে আছে, যা দিয়ে দুনিয়াতে এত এত ডিভাইস চলছে ? মাথার উপর লাইট, ফ্যান, চোখের সামনে টিভি, কম্পিউটার, শিল্প কারখানার কত কত বিশালকার যন্ত্রগুলো । রিফাত স্থির তড়িৎ নিয়ে জানে । ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রন সম্পর্কে জানে । যেখানে ইলেকট্রনগুলো ঋণাত্মক আর প্রোটনগুলো ধনাত্মক চার্জ বহন করে । ইলেকট্রনগুলো প্রোটনগুলোকে আবৃত করে রাখে বলে এরা বাইরে আসতে পারেনা । প্রোটনও কিন্তু ছাড় দেয়না । নিজের ধনাত্মক চার্জ দিয়ে সমান চার্জের এই ইলেকট্রনকে টেনে ধরে থাকে । তবে প্রোটনগুলো নিউক্লিয়াসেই থাকে । কিন্তু ইলেকট্রনগুলো মাঝে মধ্যে বাইরে থেকে শক্তি নিয়ে বাইরে বেড়িয়ে আসতে পারে । কয়েকটা ইলেকট্রনকে যদি এক জায়গায় আলাদা করে বসিয়ে রাখতে পারি তবে সেখানে কিছু চার্জ থাকবে । কিন্তু সেটা অসম্ভব না হলেও কিছুটা কঠিন ।

তবে একটা পরমাণুর থেকে কয়েকটা ইলেকট্রন বের করে নিলে সেখানে প্রোটনের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের ধনাত্মক চার্জ আধিপত্য বিস্তার করে । ফলে তখন আমরা সেই পরমাণুটিকে বলি ধনাত্মক চার্জ । অথবা পরমানুটিকে কয়েকটি ইলেকট্রন জোর করে ধরিয়ে দিলে সেখানে ঋণাত্মক ইলেকট্রনের আধিপত্য বেড়ে যায় । তখন আমরা বলি প্রোটনটা ঋণাত্মক চার্জ যুক্ত হয়েছে । এভাবে ধনাত্মক কিংবা ঋণাত্মক চার্জ যুক্ত পরমাণুকে আমরা যেকোন যায়গায় রেখে দিতে পারি । এভাবে যদি একটা চার্জকে আমরা একটা জায়গায় বসিয়ে রাখি তখন এটি এর চারদিকে প্রভাব বিস্তার করে, যাকে আমরা তড়িৎ ক্ষেত্র নামে চিনি ।

এতেই থেমে নেই । রিফাত জানে, এই চার্জকে যদি ধাক্কা দিয়ে গতিশীল করতে পারি, তবে চার্জের একটা বেগ তথা কারেন্ট পাওয়া যায় । যার গানিতিক ফর্মুলা ও জানে । কিন্তু তাতে সমস্যা কোথায় ? এতে আমরা কিভাবে এতসব ডিভাইস চালাই ? এটাই এখন ওর প্রশ্ন । এই কিভাবে প্রশ্নটার উত্তর সে কিভাবে পেতে পারে তার জন্য একে একে অনুসন্ধান চালাতে শুরু করে ।

একটা তারের মধ্যদিয়ে কারেন্ট যাচ্ছে বলতে সাধারণভাবে এটা বোঝা যায়, স্কুল ছুটি হলে যেমন শিক্ষার্থীরা একে একে লাইন ধরে সিঁড়ি বেয়ে বিল্ডিং এর নিচে নামে, তেমনি কারেন্ট যাচ্ছে বলতে এর ভিতর দিয়ে ইলেকট্রনগুলো একের পর এক ছুটে চলে । অর্থাৎ কারেন্ট যাওয়া মানে ইলেকট্রনগুলো সারিবদ্ধভাবে একেরপর এক ছুটে চলা ।

এখানে একটা প্রশ্ন অনেককেই ভাবায়, এই ইলেকট্রনগুলো চলতে শুরু করে কেন ? আমাদের চাপা সুইচটা যদি ইলেকট্রনদের জন্য স্কুলের ঘন্টা মনে করি, তবে তাদের তো হাত পা নেই । তাদের ধাক্কা না দিলে তো তারা চলতে শুরু করবেনা । আসলে তাদের চলতে বাধ্য করে তাদেরই এক অদৃশ্য এক শক্তি, যাকে আমরা ভোল্টেজ বলে থাকি । এখন তারা যদি চলতে চলতে কোন বেশি বাধা যুক্ত পথ দিয়ে চলতে শুরু করে, তখন এই পথটিতে তাদের ঘর্ষণ বেশি হয় । যার ফলে সেখানে অনেক তাপ তৈরি হয় । ফলে তারটা গলে না গেলেও আগুনের ন্যায় লাল হয়ে থাকে । টাংস্টেন হল এমন একটা বাধাযুক্ত অমসৃণ পথ । যাকে একটা তার কেটে তার মাঝখানে কেটে যুক্ত করে দেয়া হয় । অনেকটা একটা রাস্তা কেটে সেখানে ব্রিজ বসিয়ে দেয়ার মত । ইলেকট্রন যখন এই বাধাযুক্ত ব্রিজ তথা টাংস্টেন তারের মধ্যদিয়ে যায়, তখন তারটা আগুনের মত লাল হয়ে থাকে । যার আলোতে আমরা আলোকিত ।

ইলেকট্রিসিটি এখন শুধু এতেই বসে নেই । একে দিয়ে এখন শুধু কম্পিউটারই নয়, জটিলসব মাইক্রোকন্ট্রোলারের কাজ করা হচ্ছে । যেখানে প্রোগ্রামিং করে যেকোন নির্দেশনা দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়া হচ্ছে । কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন নতুন প্রযুক্তি এর উপর একের পর এক দাঁড়িয়ে যাচ্ছে । রিফাতের সেসব চিন্তা নিয়ে না হয় অন্য একদিন বলা যাবে ।

জিওন আহমেদ

Post a Comment

0 Comments