সিগনাল এবং সিস্টেম

সিগনাল পরিচিতি

সিগনাল হচ্ছে কিছু সংকেত বা বার্তা, যা কিছু সুনির্দিষ্ট অর্থ বহন করে । যেমনঃ কথা । কথা সংকেতের মাধ্যমে মানবজাতি একে অপরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে থাকে । চক্ষু দৃষ্টিও এর একটি প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ । হার্ডবিট এবং রক্তচাপ দেখে ডাক্তার রোগীর সুস্থতা-অসুস্থতা কিংবা জীবিত-মৃত অবস্থা বলে দিতে পারেন । এখানে হার্ডবিট এবং রক্তচাপ হল সিগনাল যা ডাক্তারকে রোগীর শারীরিক অবস্থার তথ্য দেয় । সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সিগনাল এক বা একাধিক রুপে আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছিন্ন অংশ । পৃথিবী নামক গ্রহে অবস্থান করে আমাদের পক্ষে এখনও কাছের কিছু গ্রহ ছাড়া দূরের গ্রহগুলোতে মানুষ পাঠানো দূরে থাক এমনকি স্যাটেলাইট পাঠানো সম্ভব হয়নি । কিন্তু আমরা এই সব গ্রহ সম্পর্কে অনেক তথ্যই জানি । জানি তাদের বয়স এবং ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে । কি করে তা সম্ভব হল ? এখানে সেই সব দূরবর্তী গ্রহ, নক্ষত্র থেকে আসা আলোক সিগনালকে অ্যানালাইসিস করে আমরা এই সব তথ্য উৎঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি ।

সেই সব গ্রহ হতে আগত আলোকে পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে আমরা সেগুলোকে বিভিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারি । যেমনঃ সময় সাপেক্ষে আগত আলোর তীব্রতা যাচাই করতে পারি । সময় সাপেক্ষে কোন একটি গ্রহ থেকে আসা আলোর তীব্রতা কমতে থাকলে আমরা প্রাথমিক সীদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি, গ্রহটি আমাদের গ্রহ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে । (যেমনটা করেছিলেন বিজ্ঞানী এডউইন হাবল তার সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্ব তত্ত্বের ক্ষেত্রে )। আবার দেখতে পারি দূরত্ব কিংবা সময় সাপেক্ষে আগত আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কিংবা কম্পাঙ্কের পরিবর্তন । এদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে আমরা গ্রহটি সম্পর্কে কিছু কমন তথ্যের আলোকে কিছু বাস্তব বৈশিষ্ট্য দ্বার করাতে পারি । এই যে আমরা আগত আলো থেকে তথ্য নিচ্ছি তা হচ্ছে কতকগুলো সিগনাল যা সুনির্দিষ্ট তথ্য বহন করে । তবে পর্যবেক্ষনের ক্ষেত্রে আমরা যেসব মানদণ্ড নিচ্ছি-সময়, দূরত্ব, তীব্রতা, তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কিংবা কম্পাঙ্ক এগুলো হচ্ছে প্রাপ্ত আলোক সিগনালের চলক । যা তৈরি হয়েছে গ্রহের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ।

তাহলে সিগনালকে আমরা এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি, সিগনাল হচ্ছে অনেকগুলো চলকের একটি ফাংশন, যা সিস্টেমের চারিত্রিক বৈশিষ্টের তথ্য বহন করে । যখন কোন সিগনাল একটি মাত্র চলকের উপর নির্ভর করে তখন সেই সিগনালকে বলা হয় এক মাত্রিক সিগনাল অনুরূপভাবে সিগনালটি যতগুলো চলকের উপর নির্ভর করে সেই সিগনালকে তত মাত্রিক সিগনাল বলে । তবে সিগনালের মাত্রা একের অধিক হলে সেই সিগনালকে মাল্টিডাইমেনশনাল সিগনাল বলা হয় । যেমন কথা একটি এক-মাত্রিক সিগনাল যার বিস্তার শুধু মাত্র সময়ের উপর নির্ভর করে ।

সিস্টেম পরিচিতি

আমরা সে সিগনাল সম্পর্কে জানলাম, এই সিগনালের উৎপত্তি স্থান হচ্ছে সিস্টেম । সিস্টেম বিহীন সিগনাল সম্ভব নয় । যেমন কথা বা শব্দ একটি সিগনাল যা কণ্ঠনালীর মাধ্যমে উৎপন্ন হয় । এখানে কন্ঠনালী একটি সিস্টেম । এক্ষেত্রে কন্ঠনালীর কার্যপ্রনালী পরিবর্তন হলে সিগনাল পরিবর্তন হবে । এভাবে একটি সিস্টেম এক বা একাধিক সিগনাল উৎপন্ন করে একটি ফাংশন উৎপন্ন করে । এক্ষেত্রে একটি ফাংশনে সিগনালগুলো বিভিন্ন গাণিতিক অপারেটরের মাধ্যমে যুক্ত থাকে ।

তাহলে সিস্টেমকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়, সিস্টেম হল একটি মাধ্যম যা একটি ফাংশন তৈরী করার জন্য এক বা একাধিক সিগনাল সম্পাদন করে থাকে । এক্ষেত্রে সিগনাল সম্পাদনার ক্ষেত্রে সিস্টেম কিছু ইনপুট সিগনাল গ্রহণ করে থাকে যা থেকে এটি বিভিন্ন আউটপুট সিগনাল দেয় ।

ব্যবহারিক জীবনে এই সিস্টেমের রয়েছে বহুল প্রয়োগ । যেমনঃ যোগাযোগ পদ্ধতি, নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, বায়োমেডিকেল পদ্ধতি ইত্যাদি ।

এদের মধ্যে যেমন যোগাযোগ পদ্ধতির রয়েছে তিনটি প্রধান সিস্টেম । যথাঃ

  1. প্রেরক ।
  2. চ্যানেল ।
  3. গ্রাহক ।

প্রেরক এক স্থানে অবস্থিত ও গ্রাহক অন্য এক স্থানে অবস্থিত । চ্যানেল হল এদের মধ্যবর্তী মাধ্যম যা প্রেরক এবং গ্রাহকের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে থাকে । প্রত্যেকটি সিস্টেমে সিগনালের প্রক্রিয়াকরণ করা হয়ে থাকে যাতে এটি পরবর্তী ধাপের জন্য উপযুক্ত হয় । সিগনালের এই প্রক্রিয়াকরণ দুই ধরণের হতে পারে । যথাঃ

  1. এনালগ পদ্ধতি ।
  2. ডিজিটাল পদ্ধতি ।

এনালগ পদ্ধতিঃ এনালগ সিগনাল প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি নির্ভর করে এনালগ বর্তনির উপাদানের উপর । যার মধ্যে রয়েছে রোধ(Resistor), ধারক(Capacitor), আবেশক(Inductors), ট্রান্সিস্টর বিবর্ধক(Transistor) এবং ডায়োড(Diode)যাদের সর্বদা ধারাবাহিক প্রবাহ বজায় থাকে ।

ডিজিটাল পদ্ধতিঃ এনালগ সিগনাল প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি নির্ভর করে এনালগ বর্তনির উপাদানের উপর । যার মধ্যে রয়েছে অ্যাডার(Adder), মাল্টিপ্লায়ার(Multiplier) এবং মেমোরি(Memory)বাইনারি আর নিউমেরিক্যাল ক্যালকুলেশনের জগতে যাদের বিচরণ ।

সিগনালের প্রকারভেদ

আমরা শুধুমাত্র এক মাত্রিক অর্থাৎ শুধু সময় চলক বিশিষ্ট সিগনালকে শ্রেনীভূক্ত করব তবে সময় মাত্রিক সিগনালকে বিস্তারের এই একটি মানের ভিত্তিতে প্রধানত দুইটি ভাগে ভাগ করা যায় ।

  1. বাস্তব মান বিশিষ্ট সিগনাল ।
  2. জটিল মান বিশিষ্ট সিগনাল ।

বাস্তব মান বিশিষ্ট সিগনালঃ যদি কোন সিগনালে সময়ের যেকোন বাস্তব মানের জন্য এর বিস্তারের মান বাস্তব হয় তবে সেই সিগনালকে বাস্তব মান বিশিষ্ট সিগনাল বলে । উদাহরণঃ


জটিল মান বিশিষ্ট সিগনালঃ যদি কোন সিগনালে সময়ের যেকোন বাস্তব মানের জন্য এর বিস্তারের মান অবাস্তব বা জটিল সংখ্যা হয় তবে সেই সিগনালকে জটিল মান বিশিষ্ট সিগনাল বলে । উদাহরণঃ


আমরা শুধুমাত্র বাস্তব মান বিশিষ্ট সময় মাত্রিক সিগনাল নিয়ে আলোচনা করব । বাস্তব মান বিশিষ্ট এক-মাত্রিক বা সময় মাত্রিক সিগনালকে পাঁচভাবে শ্রেনীভূক্ত করা যেতে পারে । যথাঃ

A.    সময়ের চলমানতা অনুসারে-

  1.        কনটিনুয়াস টাইম সিগনাল ।
  2.        ডিসক্রিট টাইম সিগনাল ।

কনটিনুয়াস টাইম সিগনালঃ যদি কোন সিগনাল সময়ের সকল মানের জন্য সংজ্ঞায়িত হয়, অর্থাৎ সময়ের যেকোন মানের জন্য এর মান থাকে তবে সেই সিগনালকে কনটিনুয়াস টাইম সিগনাল বলে ।

ডিসক্রিট টাইম সিগনালঃ যদি কোন সিগনাল সময়ের সকল মানের জন্য সংজ্ঞায়িত না হয়, অর্থাৎ সময়ের যেকোন মানের জন্য এর মান না থাকে তবে সেই সিগনালকে ডিসক্রিট টাইম সিগনাল বলে ।

B.    প্রতিসমতা অনুসারে-

1.     ইভেন সিগনাল ।

2.     অড সিগনাল ।

ইভেন সিগনালঃ যদি কোন সিগনাল দর্পণ প্রতিসম হয় তবে সেই সিগনালকে বলা হয় ইভেন সিগনাল । কোন সিগনাল দর্পণ প্রতিসম হলে তা নিচের শর্তটি মানবে ।

অড সিগনালঃ যদি কোন সিগনাল দর্পণ প্রতিসম না হয় তবে সেই সিগনালকে বলা হয় অড সিগনাল । কোন সিগনাল দর্পণ প্রতিসম না হলে তা নিচের শর্তটি মানবে ।

C.    পর্যায়বৃত্ততা অনুসারে-

1.     পর্যায়বৃত্তিক সিগনাল ।

2.     অপর্যায়বৃত্তিক সিগনাল ।

পর্যায়বৃত্তিক সিগনালঃ যদি কোন সিগনাল একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর পুনরাবৃত্ত হয় তবে সেই সিগনালকে পর্যায়বৃত্তিক সিগনাল বলা হবে । আর যে নির্দিষ্ট সময় পর পর সিগনালটি পুনরাবৃত্ত হবে সেই সময়কে বলা হয় ঐ সিগনালের পর্যায়কাল ।

অপর্যায়বৃত্তিক সিগনালঃ যদি কোন সিগনাল একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর পুনরাবৃত্ত না হয় তবে সেই সিগনালকে অপর্যায়বৃত্তিক সিগনাল বলা হবে । অর্থাৎ এক্ষেত্রে সময়ের এমন কোন মান পাওয়া সম্ভব নয় যার জন্য সিগনালটি পুনরাবৃত্ত হয় ।  

D.   নিশ্চয়তা অনুসারে-

1.     ধারাবাহিক বা ডিটারমিনিস্টিক সিগনাল ।

2.     এলোমেলো বা র‍্যানডোম সিগনাল ।

ধারাবাহিক বা ডিটারমিনিস্টিক সিগনালঃ যে সিগনালের সময় সাপেক্ষে মানের ধারাবাহিকতা থাকে তাকে বলা হয় ধারাবাহিক বা ডিটারমিনিস্টিক সিগনাল । সময় সাপেক্ষে মানের সমজ্জস্যতা থাকে বিধায় এই সিগনালকে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হয় । সেই দৃষ্টিকোণ থেকেও বলা যায়, যদি কোন সিগনালকে গাণিতিক রূপ দেওয়া সম্ভব হয় তবে সেই সিগনালকে বলা হয় ধারাবাহিক বা ডিটারমিনিস্টিক সিগনাল ।

এলোমেলো বা র‍্যানডোম সিগনালঃ যে সিগনালের সময় সাপেক্ষে মানের ধারাবাহিকতা থাকে না তাকে বলা হয় এলোমেলো বা র‍্যানডোম সিগনাল । সময় সাপেক্ষে মানের সমজ্জস্যতা থাকেনা বিধায় এই সিগনালকে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না । সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এক্ষেত্রেও বলা যায়, যদি কোন সিগনালকে গাণিতিক রূপ দেওয়া সম্ভব না হয় তবে সেই সিগনালকে বলা হয় এলোমেলো বা র‍্যানডোম সিগনাল । 

E.    তাড়িত ক্ষেত্রে প্রয়োগ অনুসারে-

  1.        এনার্জি বা শক্তি সিগনাল ।
  2.        পাওয়ার বা ক্ষমতা সিগনাল ।


জিওন আহমেদ

Post a Comment

0 Comments